প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
বাংলার ঘরে উৎসব মানেই শুধু প্রদীপের আলো, ধূপের গন্ধ কিংবা নতুন পোশাক নয়। উৎসবের নিজস্ব কিছু চিহ্নও থাকে। তার মধ্যে আলপনা যেন সবচেয়ে আপন। মাটির উঠোনে, বাড়ির দাওয়ায় কিংবা ঠাকুরঘরের সামনে চালের গুঁড়ো দিয়ে আঁকা সাদা নকশার মধ্যে বাঙালির উৎসবের স্মৃতি বহু প্রজন্ম ধরে জমে আছে। আর লক্ষ্মীপুজোর আলপনা বললেই যে ছবিটি সবচেয়ে আগে চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তা হল ছোট ছোট পায়ের ছাপ—যেন দেবী নিজেই স্বর্গ থেকে নেমে এসে ঘরের দিকে এগিয়ে আসছেন।
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর রাতে বাংলার অসংখ্য বাড়িতে তাই আলপনা আঁকার প্রস্তুতি শুরু হয়। চাল ভিজিয়ে বেটে তৈরি করা হয় পিটুলি। সেই সাদা পিটুলির রেখায় আঁকা হয় পদ্ম, শঙ্খ, ধানের ছড়া, শস্যের প্রতীক, লতাপাতা, প্রদীপ এবং অবশ্যই লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ। কোথাও পায়ের ছাপগুলি উঠোন থেকে ঠাকুরঘরের দিকে এগিয়ে যায়, কোথাও আবার দরজার বাইরে থেকে শুরু হয়ে দেবীর আসনের সামনে এসে থামে। যেন অদৃশ্য দেবীর দৃশ্যমান আগমনের পথটি সাদা রেখায় এঁকে রাখা হচ্ছে।
কিন্তু কেন লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ? এর নেপথ্যে রয়েছে এক গভীর প্রতীকী ভাবনা। বাংলার লোকবিশ্বাসে লক্ষ্মী হলেন ধন-সম্পদ, শস্য, সৌভাগ্য, সমৃদ্ধি ও গৃহকল্যাণের দেবী। তাঁর আগমন মানেই ঘরে শুভ শক্তির আগমন। তাই দরজা থেকে ঘরের ভিতরের দিকে আঁকা পায়ের ছাপ আসলে দেবীকে ঘরে আমন্ত্রণ জানানোর প্রতীক। অন্যভাবে বললে, আলপনায় আঁকা সেই পা যেন পরিবারের পক্ষ থেকে বলা একটি নীরব প্রার্থনা—‘মা, আমাদের ঘরে এসো।’এখানেই লক্ষ্মীর পায়ের আলপনার সবচেয়ে সুন্দর তাৎপর্য। সাধারণত কোনও মানুষ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে তাঁর পায়ের ছাপ বাইরের দিকে যায়। কিন্তু লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ আঁকা হয় ঘরের ভিতরের দিকে। কারণ উদ্দেশ্য দেবীর প্রস্থান নয়, তাঁর আগমন। তাই অনেক বাড়িতে দরজার চৌকাঠ থেকে শুরু করে লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ এমনভাবে আঁকা হয়, যেন মনে হয় দেবী সদ্য ঘরে প্রবেশ করেছেন।এই পায়ের ছাপ শুধু সমৃদ্ধির আহ্বান নয়, এটি গৃহস্থ জীবনের এক প্রাচীন দর্শনেরও প্রতীক। কৃষিনির্ভর বাংলায় লক্ষ্মী ছিলেন মূলত শস্য ও উর্বরতার দেবী। ধান, গোলাভরা শস্য, গরু, গৃহস্থের সুখ—সবকিছুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তাই লক্ষ্মীপুজোর আলপনায় ধানের শিষ বা শস্যের প্রতীক দেখা যায়। দেবীর পদচিহ্নের সঙ্গে এই শস্যচিহ্ন যেন বলে—ঘরে যেন অন্নের অভাব না হয়, গোলা যেন পূর্ণ থাকে, সংসারে যেন শান্তি থাকে।
আলপনার সঙ্গে ধানের এই সম্পর্কটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একসময় বাংলার গ্রামীণ জীবনে ধান ছিল সম্পদের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি। যে বাড়ির গোলা ধানে ভরা, সেই বাড়ির আর্থিক নিরাপত্তা অনেক বেশি। ফলে ‘লক্ষ্মী এসেছে’ কথাটির সঙ্গে শুধু টাকা-পয়সা নয়, অন্ন ও শস্যের প্রাচুর্যও জড়িয়ে ছিল। সেই কারণেই লক্ষ্মীপুজোর প্রতীকগুলির মধ্যে ধানের শিষ এত গুরুত্বপূর্ণ।লক্ষ্মীর পায়ের সঙ্গে পদ্মের সম্পর্কও গভীর। পদ্ম দেবীর অন্যতম পরিচিত প্রতীক। কাদাজলে জন্ম নিয়েও পদ্ম যেমন নির্মল ও সুন্দর হয়ে ফুটে ওঠে, তেমনই মানুষের সংসারজীবনেও পবিত্রতা, সৌন্দর্য ও শুভবোধের কামনা করা হয়। আলপনায় পদ্ম তাই শুধু সাজসজ্জার উপাদান নয়; এটি শুভতা ও পবিত্রতার প্রতীক। অনেক বাড়ির লক্ষ্মী আলপনায় পদ্মের কেন্দ্রেই দেবীর আসন তৈরি করা হয়।
আলপনা শব্দটির মধ্যেও লুকিয়ে আছে বাংলার লোকশিল্পের দীর্ঘ ইতিহাস। গ্রামীণ বাংলায় উৎসব, ব্রত, বিয়ে কিংবা বিশেষ পারিবারিক অনুষ্ঠানে মাটি ও উঠোন সাজানোর রীতি বহু পুরনো। চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি সাদা নকশা ছিল তার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কারণ চাল শুধু সহজলভ্য ছিল না, খাদ্যশস্য হিসেবেও ছিল পবিত্র। সেই চাল থেকেই তৈরি পিটুলি দিয়ে দেবীর পথ আঁকা—এই রীতির মধ্যে খাদ্য, পবিত্রতা ও সমৃদ্ধির প্রতীকী সম্পর্কটি খুব সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে।লক্ষ্মীপুজোর আলপনা আসলে এক ধরনের ‘আমন্ত্রণপত্র’। কাগজে লেখা নয়, মাটির উপর আঁকা। তাতে কোনও শব্দ নেই, অথচ তার অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট। পদ্ম বলছে শুভতার কথা, ধানের শিষ বলছে অন্নের কথা, প্রদীপ বলছে আলোর কথা, আর পায়ের ছাপ বলছে—দেবী এসেছেন।
তবে লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ সব বাড়িতে একরকম নয়। কোথাও পায়ের আঙুলগুলি স্পষ্ট করে আঁকা হয়, কোথাও শুধু পায়ের একটি সরল প্রতীক। কোথাও পায়ের ছাপ ছোট ছোট করে পাশাপাশি আঁকা হয়, আবার কোথাও বড় করে দরজা থেকে ঠাকুরঘর পর্যন্ত টেনে দেওয়া হয়। অঞ্চল, পরিবার এবং স্থানীয় রীতির সঙ্গে সঙ্গে আলপনার নকশাতেও পরিবর্তন দেখা যায়। এই বৈচিত্র্যই বাংলার লোকশিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
একসময় আলপনা আঁকার দায়িত্ব মূলত বাড়ির মহিলাদের হাতেই থাকত। পুজোর আগের দিন থেকেই বাড়িতে শুরু হয়ে যেত প্রস্তুতি। চাল ভেজানো, পিটুলি তৈরি করা, উঠোন পরিষ্কার করা—সবশেষে মাটির উপর বসে ধীরে ধীরে নকশা আঁকা। এই কাজটি ছিল নিছক সৌন্দর্যচর্চা নয়; ছিল পারিবারিক ও সামাজিক আচার। মায়ের কাছ থেকে মেয়ে, ঠাকুমার কাছ থেকে নাতনি শিখত কোন নকশা কোথায় আঁকতে হয়, কীভাবে লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ দিতে হয়, কোন দিকে দেবীর পা থাকবে।
এই শেখার মধ্যেই তৈরি হয়েছে বাংলার নারীদের এক নিজস্ব লোকশিল্পের পরম্পরা। কোনও শিল্পবিদ্যালয়ের প্রশিক্ষণ নয়, কোনও লিখিত পাঠ্যবই নয়—প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হাতে হাতে শেখা। ফলে প্রতিটি বাড়ির আলপনায় থাকে সেই পরিবারের নিজস্ব ছাপ। একজনের আঁকা পদ্ম অন্যজনের থেকে আলাদা, কারও পায়ের ছাপ সরু, কারওটি গোল। কোথাও জ্যামিতিক নকশা, কোথাও আবার লতাপাতার অবাধ বিস্তার।শহুরে জীবনে আজ সেই চিত্র অনেকটাই বদলেছে। ফ্ল্যাটবাড়িতে মাটির উঠোন নেই, সময়ের অভাব রয়েছে, চাল বেটে পিটুলি তৈরি করার অভ্যাসও অনেকের নেই। তাই বাজারে পাওয়া স্টেনসিল, আলপনা আঁকার ছাঁচ বা রেডিমেড নকশার ব্যবহার বেড়েছে। তবু লক্ষ্মীর পায়ের ছাপের জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং আধুনিক বাড়ির দরজার সামনে, বারান্দায় কিংবা ঠাকুরের আসনের কাছে ছোট্ট করে আঁকা সেই পায়ের ছাপ এখনও একই অর্থ বহন করে—শুভ আগমন।
আধুনিক শিল্পীরা আলপনাকে আরও নানা রূপ দিয়েছেন। সাদা চালের গুঁড়োর পাশাপাশি রঙিন আলপনা, অ্যাক্রিলিক, রঙিন গুঁড়ো কিংবা ফুলের পাপড়ি দিয়েও তৈরি হচ্ছে নকশা। কিন্তু উপকরণ বদলালেও মূল প্রতীকটি থেকে গেছে। কারণ ঐতিহ্যের প্রাণ তার বাহ্যিক রূপে নয়, তার অর্থে।
লক্ষ্মীর পায়ের ছাপের আর একটি সুন্দর দিক হল এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ‘ঘর’-এর ধারণা। লক্ষ্মীকে শুধু ধনসম্পদের দেবী হিসেবে দেখলে এই প্রতীকের অনেকটাই হারিয়ে যায়। বাংলার গৃহস্থ সংস্কৃতিতে লক্ষ্মী হলেন সংসারের শান্তি, পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও প্রাচুর্যের প্রতীক। তাই লক্ষ্মীপুজোর আগে বাড়ি পরিষ্কার করার রীতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বাস, পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর ঘরেই লক্ষ্মীর আগমন ঘটে।এই বিশ্বাসের সঙ্গে আলপনার সম্পর্কও গভীর। পরিষ্কার করা মাটির উপর সাদা আলপনা যেন গৃহকে পবিত্র করে তোলে। দরজার সামনে আঁকা পায়ের ছাপ জানিয়ে দেয়—এই ঘর প্রস্তুত, এই ঘর দেবীকে বরণ করার জন্য তৈরি। অর্থাৎ আলপনা একসঙ্গে সৌন্দর্য ও বিশ্বাসের ভাষা।
আজকের দিনে আমরা ‘সমৃদ্ধি’ বলতে অনেক সময় শুধু অর্থনৈতিক সাফল্যকে বুঝি। কিন্তু লক্ষ্মীর পায়ের আলপনার পুরনো অর্থ আরও বিস্তৃত। অন্ন, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, শান্তি, পারিবারিক সুখ, কৃষির সাফল্য, গৃহের নিরাপত্তা—সবই ছিল সমৃদ্ধির অংশ। তাই দেবীর পায়ের ছাপ আঁকার সময় প্রার্থনাটিও ছিল অনেক বড়—শুধু ধন নয়, ঘর যেন পূর্ণ থাকে জীবনের প্রয়োজনীয় সবকিছুতে।
সম্ভবত এ কারণেই এত শতাব্দী পেরিয়েও লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ বাঙালির ঘরে এত আপন। একটি ছোট্ট প্রতীক কীভাবে এত বড় একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতি বহন করতে পারে, তার সুন্দর উদাহরণ এই আলপনা। সেখানে একই সঙ্গে রয়েছে কৃষিজীবী বাংলার স্মৃতি, নারীর লোকশিল্প, গৃহস্থের স্বপ্ন, দেবীর প্রতি ভক্তি এবং শুভ ভবিষ্যতের প্রত্যাশা।কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর রাতে যখন দরজার বাইরে থেকে ঘরের ভিতর পর্যন্ত সাদা সাদা পায়ের ছাপ আঁকা হয়, তখন আসলে একটি পুরনো গল্পই আবার বলা হয়। বহু প্রজন্ম আগে কোনও এক বাঙালি গৃহবধূ হয়তো প্রথমবার চালের গুঁড়ো দিয়ে দেবীর পায়ের চিহ্ন এঁকেছিলেন। সেই রেখা সময়ের সঙ্গে বদলেছে, নকশা বদলেছে, বাড়ি বদলেছে, জীবন বদলেছে—কিন্তু প্রার্থনাটি বদলায়নি।
আজও আলপনায় সেই পা ঘরের দিকে এগিয়ে আসে। আর প্রতিবারই মনে হয়, দেবী যেন শুধু ধনসম্পদ নিয়ে আসছেন না—নিয়ে আসছেন অন্নের নিশ্চয়তা, সংসারের শান্তি, প্রিয়জনের সুস্থতা এবং আগামী দিনের আশ্বাস।তাই লক্ষ্মীর পায়ের আলপনা আসলে একটি ছবি নয়। এটি বাঙালির ঘরে লেখা এক নীরব প্রার্থনা। চালের সাদা রেখায় আঁকা সেই ছোট্ট পায়ের ছাপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সমৃদ্ধি মানে শুধু কতটা পাওয়া নয়, ঘরটিকে কতটা ভালোবাসা, যত্ন আর শুভকামনায় ভরে রাখা।
লক্ষ্মীর পা তাই আজও দরজা পেরিয়ে ঘরের ভিতরের দিকে আসে। আর সেই পায়ের ছাপের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার ঘরে ফিরে আসে এক পুরনো বিশ্বাস—শুভ আগমন মানেই নতুন আশার শুরু।