28th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

জামাপুকুর চন্দ্রবাড়ি, যেখানে দুর্গার রূপেই লুকিয়ে আছে পুজোর সবচেয়ে বড় চমক!

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


কলকাতার পুরনো পাড়াগুলির অলিগলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ এমন কোনও বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ানো যায়, যার বাইরের ব্যস্ততার সঙ্গে ভিতরের জগতের কোনও মিলই নেই। বাইরে তখন দোকানের ভিড়, গাড়ির শব্দ, মানুষের ছোটাছুটি। অথচ একটি পুরনো সদর দরজা পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলেই যেন শহরের বর্তমানটা ধীরে ধীরে পিছিয়ে যায়। পুরনো ঠাকুরদালান, চেনা স্থাপত্য, ধূপের গন্ধ আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা কোনও পুজোর আচার মনে করিয়ে দেয়, এই কলকাতার বুকেই এখনও কোথাও কোথাও সময় থেমে আছে।

২৪এ, বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটের চন্দ্রবাড়ি তেমনই এক বাড়ি। থানথানিয়া কালীবাড়ির কাছাকাছি এই বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোকে ঘিরে রয়েছে বহু পুরনো পারিবারিক ইতিহাস। তবে এই পুজোর সবচেয়ে বড় চমক তার বয়সে নয়, দেবীর রূপে। এখানে দুর্গা প্রচলিত দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী নন। এখানে তিনি হরপার্বতী—মহাদেবের কোলে আসীন গৌরী। দেবীর এই মূর্তিই চন্দ্রবাড়ির দুর্গাপুজোকে কলকাতার অন্যান্য বনেদি পুজোর থেকে একেবারে আলাদা করে দিয়েছে।চন্দ্র পরিবারের পুজোর ইতিহাসের শিকড় কলকাতারও আগের। পরিবারের আদি নিবাস ছিল সপ্তগ্রামে। সেখানেই চলত পারিবারিক পুজো। পরে কলকাতায় এসে পরিবারের বিভিন্ন শাখা বিভিন্ন জায়গায় বসতি গড়ে তোলে এবং পুজোর ধারাও সেই সঙ্গে স্থান বদল করতে থাকে। একসময় ব্রজদুলাল স্ট্রিটের বাড়িতে পুজো হত। পরবর্তীকালে চন্দ্র পরিবারের একটি শাখা চলে আসে বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটে, অন্য একটি শাখার ঠিকানা হয় থানথানিয়ার কাছে বিধানসরনি।

এই বাড়িটির সঙ্গে পুজোর নতুন অধ্যায়ের সূত্রপাত শ্রীনাথচন্দ্রের হাত ধরে। চোরবাগানের মিত্রদের কাছ থেকে বাড়িটি কেনার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এখানেই আবার মহাসমারোহে পারিবারিক দুর্গাপুজো শুরু করবেন। ১৮৫০ সালে সেই পুজো নতুন করে শুরু হয়। শুভ কাজের সূচনায় দেবীর হাতে দেওয়া হয়েছিল সেই বছরের একটি মোহর। আজও ১৮৫০ সালের সেই মোহর পুজোর সময়ে দেবীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। একটি পুরনো মুদ্রা তাই চন্দ্রবাড়ির কাছে শুধু মূল্যবান ধাতু নয়, পরিবারের ইতিহাসের স্পর্শযোগ্য স্মারক।

আজকের চন্দ্রবাড়ির চারপাশ অবশ্য সেই সময়ের মতো নেই। একদিন যেখানে ছিল সবুজ মাঠ, ধানজমি, বড় পুকুর আর নির্জন রাস্তা, সেখানে এখন শহরের ঘনবসতি। সরু গলির দুপাশে দোকান, লোহালক্কড়ের কারবার, গাড়ির ভিড়। কিন্তু বাড়ির চৌহদ্দির ভিতরে পা রাখলেই যেন হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া কলকাতার একটি টুকরো চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। আর সেই পুরনো সময়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল চিহ্ন হয়ে থাকে ঠাকুরদালানের দুর্গাপুজো।চন্দ্রবাড়ির দেবীর রূপটি এই পুজোর প্রাণ। এখানে মহিষাসুর নেই। দেবী হরপার্বতী রূপে মহাদেবের কোলে আসীন। এই মূর্তিতে যুদ্ধের চেয়ে সংসারের মঙ্গল, অসুরবধের চেয়ে দাম্পত্যের সৌন্দর্য এবং উগ্রতার চেয়ে মাতৃরূপ যেন বেশি স্পষ্ট। পরিবারের বৈষ্ণব ভাবধারার সঙ্গেও এই প্রতিমার রূপের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

দেবীর দুই পাশে থাকেন লক্ষ্মী, গণেশ, সরস্বতী ও কার্তিক। সিংহাসনে থাকেন জয়া ও বিজয়া। প্রতিমায় ডাকের সাজের ঐতিহ্য রয়েছে। আর প্রতিমার অলংকারেও রয়েছে পরিবারের দীর্ঘদিনের সঞ্চিত ঐতিহ্যের ছাপ। গণেশের খড়ম, শিবের খড়ম, দেবীর মুকুট, শঙ্খ, চক্র, গদা—বহু সামগ্রীই সোনা বা রুপোর তৈরি। ফলে দেবীর সাজ শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, পরিবারের ইতিহাসেরও একটি অংশ।প্রতিমার চালচিত্রেও রয়েছে অন্যরকম বিন্যাস। সেখানে দশমহাবিদ্যার পাশাপাশি থাকে মহিষাসুরমর্দিনীর ছবি। মূল প্রতিমায় যেখানে মহিষাসুরের স্থান নেই, চালচিত্রে আবার সেই প্রচলিত দুর্গার রূপের উপস্থিতি। যেন একই ঠাকুরদালানে দেবীর দুই ভিন্ন ভাবনার সহাবস্থান।

পুজোর প্রস্তুতিও শুরু হয় নির্দিষ্ট রীতিতে। জন্মাষ্টমীর দিনে সিদ্ধি-সিঁদুর কেনা হয়। উল্টো রথের দিন হয় কাঠামো পুজো এবং তার পর শুরু হয় প্রতিমা তৈরির কাজ। মহালয়ার পরের দিন, অর্থাৎ প্রতিপদে দেবীর ঘট বসানো হয়। সেই দিন থেকেই শুরু হয় চণ্ডীপাঠ। ষষ্ঠীর দিন হয় বোধন এবং সেই দিন থেকেই ঠাকুরদালানে মূল পুজোর সূচনা।চন্দ্র পরিবারের কূলদেবতা শ্রী সীতানাথ জিউ। তাঁর সঙ্গে থাকেন ধান্যলক্ষ্মী। সপ্তমীর দিন সীতানাথ জিউ ও ধান্যলক্ষ্মীকে উপরে থেকে ঠাকুরদালানে নিয়ে আসা হয়। পুজো শেষে তাঁদের আবার উপরে তুলে দেওয়া হয়। পরের দিন পুজো শুরুর আগে আবার নীচে নিয়ে আসা হয়। এই আচারও পরিবারের নিজস্ব ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সীতানাথ জিউ ও ধান্যলক্ষ্মীকে ঘিরে রয়েছে আরও একটি বিশেষ পারিবারিক রীতি। তাঁরা তিন বছর চন্দ্রবাড়িতে থাকেন এবং পরের বছর যান ঝামাপুকুরের অন্য বাড়িতে। যে বছর তাঁরা ঝামাপুকুরে থাকেন, সেই বছর চন্দ্রবাড়িতে তাঁদের খড়ম পুজো করা হয়। অর্থাৎ দেবতার উপস্থিতি কখনও মূর্তিতে, কখনও তাঁর প্রতীকে—কিন্তু পুজোর ধারাটি থেমে থাকে না।

সপ্তমীর দিন কলাবউ স্নানের পর তাঁকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। সপ্ততীর্থের জল দিয়ে তাঁকে স্নান করানো হয়। এরপর দেবীর চক্ষুদান হয়। আর সেই দিন থেকেই শুরু হয় আর একটি বিশেষ আচার—হোম।চন্দ্রবাড়ির হোমকুণ্ডে গরান কাঠের আগুন সপ্তমীর দিন প্রজ্বলিত করা হয়। সেই আগুন পুজোর শেষ দিন পর্যন্ত জ্বলতে থাকে। মাঝখানে তা নেভানো হয় না। নবমীর দিন আরতির পর হোমকুণ্ডের আগুন নেভানো হয়। কয়েক দিন ধরে অবিচ্ছিন্নভাবে জ্বলতে থাকা সেই আগুন যেন পুজোর অন্তর্গত সাধনারই প্রতীক।

চন্দ্রবাড়ির পুজোর সঙ্গে পরিবারের মহিলাদের স্মৃতিও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। দেবীর পায়ের কাছে রাখা হয় একটি বড় সিঁদুরের বাক্স। ১৮৫০ সাল থেকে এই পরিবারের যে সমস্ত মেয়ের বিয়ে হয়েছে এবং যে সমস্ত পুত্রবধূ এই বাড়িতে এসেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের একটি করে সিঁদুরের কৌটো সেই বাক্সে রাখা হয়েছে। ফলে সেই বাক্সের ভিতরে জমা রয়েছে একের পর এক প্রজন্মের বিবাহিত জীবনের স্মৃতি। কোনও অলংকারের মতোই সেটিও পরিবারের কাছে এক অমূল্য উত্তরাধিকার।

অষ্টমীর সন্ধিপুজোর পর বাড়ির বউরা ধুনো পোড়ান। ধূপ-ধুনোর গন্ধে তখন ভরে ওঠে ঠাকুরদালান। আর বৈষ্ণব মতে পুজো হওয়ায় এখানে কোনও পশুবলি হয় না। তার পরিবর্তে মাসকলাই সিঁদুরে মাখিয়ে দেবীকে নিবেদন করা হয়। পাশাপাশি ১০৮টি প্রদীপ সাজিয়ে দেওয়া হয় ঠাকুরদালানে। প্রদীপের আলো, ধুনোর ধোঁয়া, মন্ত্রোচ্চারণ আর দেবীর হরপার্বতী রূপ—সব মিলিয়ে অষ্টমীর সন্ধ্যা হয়ে ওঠে এই বাড়ির পুজোর অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।

চন্দ্রবাড়ির পুজোয় পোশাক ও অলংকারেরও রয়েছে নির্দিষ্ট রীতি। পুজোর দিন পরিবারের মেয়েদের নাকে নথ এবং পায়ে মল পরা আবশ্যিক। যেন পুজোর সাজও হয়ে ওঠে পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ।

আর ভোগ? সেখানেও রয়েছে বনেদি বাড়ির পুরনো রান্নাঘরের গন্ধ। পুজোর সময়ে বাড়িতে বসে ভিয়েন। লুচি, আলুভাজা, নারকেল নাড়ু, নানা রকম মিষ্টি, রসবড়া, চন্দ্রপুলি, চালের নৈবেদ্য এবং বিভিন্ন ফল দিয়ে সাজানো হয় দেবীর ভোগ। প্রতিদিন ১৭টি থালায় চাল, কলা ও মিষ্টি দিয়ে নৈবেদ্য দেওয়া হয়। সন্ধ্যার আরতির পরে দেবীকে নিবেদন করা হয় দুধ ও মিষ্টি।পুরনো রীতির প্রতি চন্দ্র পরিবারের নিষ্ঠার সবচেয়ে আকর্ষণীয় উদাহরণগুলির একটি দেখা যায় পুরোহিতের দক্ষিণাতেও। পুজো শেষে প্রথমে পুরোহিতকে ১৭৪৯ সালের একটি রুপোর কয়েন দিয়ে প্রতীকী দক্ষিণা দেওয়া হয়। ঠাকুরকে সাক্ষী রেখে সেই প্রাচীন মুদ্রা নিবেদন করার পরে সেটি ফিরিয়ে নেওয়া হয় এবং তার পরিবর্তে বর্তমান মূল্যে পুরোহিতকে দক্ষিণা দেওয়া হয়। কয়েক শতাব্দী পুরনো একটি মুদ্রা আজও এই রীতির মধ্য দিয়ে পুজোর সঙ্গে যুক্ত থাকে।

দশমীতেও রয়েছে নিজস্ব আচার। দেবীর বরণের পরে চাল, মিষ্টি ও রুপো দিয়ে কনকাঞ্জলি দেওয়া হয়। তারপর দেবী যতক্ষণ বাড়িতে থাকেন, পরিবারের মহিলারা আর তাঁর মুখ দেখতে পান না। আর মহালয়ার দিন থেকেই চন্দ্রবাড়িতে মাছ খাওয়া বন্ধ থাকে। দেবীর বিসর্জনের পরে দশমীর দিন মাছ কিনে তবে পরিবারের সদস্যরা মাছ খান। পুজোর কয়েকটি দিনের খাদ্যসংযম আর বিসর্জনের পরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার এই রীতিও পরিবারের নিজস্ব বিশ্বাসের অংশ হয়ে রয়েছে।

একসময় এই পুজোকে কেন্দ্র করে বাড়িতে বসত যাত্রার আসর। চিৎপুরে গিয়ে পালার বায়না করে আনতেন বাড়ির কর্তারা। কীর্তনের আসরও বসত। শোনা যায়, নীলদর্পণ নাটকের দ্বিতীয় অভিনয়ও হয়েছিল এই বাড়িতে। অর্থাৎ চন্দ্রবাড়ির পুজো একসময় শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না, ছিল একটি বড় সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্রও।সময়ের সঙ্গে সেই আড়ম্বর অনেকটাই কমেছে। যাত্রার আসর আর বসে না, কীর্তনের পুরনো আয়োজনও নেই। কলকাতার সেই পুরনো পরিবেশও নেই। মাঠের জায়গায় উঠেছে বাড়ি, সরু রাস্তার জায়গায় বেড়েছে যানবাহন, পুরনো নিস্তব্ধতার জায়গায় এসেছে শহরের চিরচেনা কোলাহল। কিন্তু চন্দ্রবাড়ির ঠাকুরদালানে পুজোর নিষ্ঠা এখনও অটুট।এই পুজোর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য বোধহয় এখানেই। ঐতিহ্য মানে সবকিছুকে আগের মতো হুবহু ধরে রাখা নয়। বরং সময় বদলালেও যে বিশ্বাসটুকু প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে যায়, সেটিই হয়ে ওঠে সত্যিকারের উত্তরাধিকার। চন্দ্রবাড়ির হরপার্বতীও তাই শুধু একটি প্রতিমা নন। তিনি এক পরিবারের বহু প্রজন্মের স্মৃতি, বিশ্বাস ও আবেগের কেন্দ্র।

দেবী যখন মহাদেবের কোলে আসীন হন, তখন তাঁর মধ্যে যেন বাঙালির দুর্গাপুজোর আর একটি পরিচিত ছবি ফিরে আসে—মেয়ে যে শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়িতে আসে। যুদ্ধের দেবী নন, ঘরের মেয়ে। তাঁর আগমনে বাড়ি ভরে ওঠে, রান্নাঘরে ভিয়েন বসে, উঠোনে আলো জ্বলে, মেয়েদের নথ-মল পরে সাজতে হয়, ধুনোর ধোঁয়ায় সন্ধ্যা ঘন হয়। আবার দশমী আসে। কনকাঞ্জলি হয়। দেবী বিদায় নেন।তারপর ঠাকুরদালান ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যায়।

কিন্তু ১৮৫০ সালের সেই মোহর থেকে ১৭৪৯ সালের রুপোর কয়েন, সিঁদুরের বাক্স থেকে ১০৮ প্রদীপ, হরপার্বতীর মূর্তি থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের পুজোর স্মৃতি—সবই থেকে যায়। চন্দ্রবাড়ির দেয়াল যেন নিঃশব্দে বলে যায়, শহর যতই বদলাক, মানুষের জীবনে কিছু কিছু উৎসব থাকে, যাদের আসল ঠিকানা কোনও ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, কোনও বাড়ির ঠাকুরদালানও নয়—তাদের ঠিকানা মানুষের স্মৃতিতে। আর সেই স্মৃতির মধ্যেই প্রতি শরতে আবার ফিরে আসেন চন্দ্রবাড়ির হরপার্বতী।

Archive

Most Popular