28th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

নদীয়ার নবদ্বীপের বনেদি বাড়ির পুজো, বৈষ্ণব সংস্কৃতির ছোঁয়ায় মা দুর্গার আরাধনা..

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


নবদ্বীপ বললেই প্রথমে মনে পড়ে শ্রীচৈতন্যের কথা। গৌড়ীয় বৈষ্ণবধারার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এই প্রাচীন জনপদে কীর্তন, নামসংকীর্তন, রাধাকৃষ্ণের ভক্তি এবং বৈষ্ণব সংস্কৃতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে রয়েছে। অথচ সেই নবদ্বীপেরই অলিগলিতে শরৎ এলেই বেজে ওঠে ঢাক, জ্বলে ওঠে ধূপের ধোঁয়া, সাজে ঠাকুরদালান, আর অধিষ্ঠিত হন মা দুর্গা। তাই নবদ্বীপের দুর্গাপুজোর ইতিহাস শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের ইতিহাস নয়; এটি বাংলার বহুত্ববাদী সংস্কৃতিরও এক অনন্য দলিল। বৈষ্ণব আবহের মধ্যে শাক্ত আরাধনার এই সহাবস্থানই নবদ্বীপের বনেদি বাড়ির পুজোগুলিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।নবদ্বীপের প্রাচীন বনেদি পুজোর তালিকায় ভট্টাচার্য বাড়ির লালদুর্গা এবং বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গোৎসব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি চন্দ্র পরিবারের মতো আরও কিছু পুরনো বাড়িতেও সাবেকি রীতিতে দুর্গার আরাধনা হয়ে আসছে। এই পুজোগুলির প্রতিটিরই রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, প্রতিমার নিজস্ব রূপ এবং পারিবারিক কিছু বিশেষ রীতি। ফলে নবদ্বীপে দুর্গাপুজো দেখতে গেলে শুধু একটি বাড়ির ইতিহাস নয়, এক বিস্তৃত সাংস্কৃতিক পরম্পরার সামনে দাঁড়াতে হয়।

এর মধ্যে যোগনাথতলার ভট্টাচার্য বাড়ির লালদুর্গা পুজো সবচেয়ে রহস্যময় অধ্যায়গুলির একটি। প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো এই পুজোর দেবী সাধারণ দুর্গামূর্তির মতো নন। তাঁর গাত্রবর্ণ টকটকে লাল। একচালা সাবেকি প্রতিমায় তিনি রাজরাজেশ্বরীরূপে পূজিতা হন। শুধু দেবীর রং নয়, তাঁর প্রতিমার আরও কিছু বৈশিষ্ট্য এই পুজোকে আলাদা করে দেয়। এখানে দেবীর বাহন সাধারণ সিংহ নয়, নরসিংহরূপে পূজিত হন। প্রতিমায় গণেশ থাকেন বাঁ দিকে এবং কার্তিক ডান দিকে। এই রীতিগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে।

কিন্তু কেন এই দুর্গার গায়ের রং লাল? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে রয়েছে ভট্টাচার্য পরিবারের পুজোর সবচেয়ে আলোচিত কাহিনি। প্রচলিত পারিবারিক ইতিহাস অনুযায়ী, সপ্তদশ শতকের এক নবমী তিথিতে পরিবারের তৎকালীন গৃহকর্তা রাঘবরাম ভট্টাচার্য চণ্ডীপাঠ করছিলেন। পাঠের মধ্যে তাঁর তৃতীয় পুত্র রামভদ্র একটি ভুল ধরিয়ে দেন। রাঘবরাম রুষ্ট হয়ে পাঠ বন্ধ করে রামভদ্রকেই মন্ত্রোচ্চারণের দায়িত্ব দেন। আর তখনই ঘটে যায় সেই অলৌকিক ঘটনা, যার ছাপ আজও এই পুজোর প্রতিমায় রয়ে গেছে বলে বিশ্বাস করা হয়।কথিত আছে, সেই সময় দক্ষিণমুখী প্রতিমা ঘুরে পশ্চিমমুখী হয়ে রামভদ্রের দিকে তাকায়। এরপর ধীরে ধীরে দেবীর গাত্রবর্ণ হলুদ থেকে রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে রামভদ্র ক্রমশ ফ্যাকাসে হয়ে পড়েন এবং চণ্ডীপাঠ শেষ হওয়ার পর দেবীর পায়ের কাছে তাঁর মৃত্যু হয়। বিসর্জনের সময় প্রতিমার সঙ্গে তাঁর দেহও নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল বলে প্রচলিত কাহিনি। সেই ঘটনার পর থেকে ভট্টাচার্য বাড়ির পুজোয় আর চণ্ডীপাঠ করা হয় না। আজও দেবী পশ্চিমমুখী হয়েই পূজিতা হন।

ইতিহাস আর লোকবিশ্বাসের এই মিশেলই লালদুর্গা পুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। এই কাহিনির সত্যতা নিয়ে আধুনিক ইতিহাসের মাপকাঠিতে প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু একটি পরিবারের কয়েক শতাব্দীর ধর্মীয় স্মৃতি ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। কারণ বনেদি বাড়ির পুজোর ইতিহাসের একটা বড় অংশই লিখিত দলিলের পাশাপাশি মুখে মুখে বেঁচে থাকে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বলা গল্পই একসময় হয়ে ওঠে পরিবারের পরিচয়ের অংশ।নবদ্বীপের আর একটি উল্লেখযোগ্য পুজো বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গোৎসব। ২০২৬ সালে এই পুজো ২৬৩ বছরে পড়েছে। এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু পুরনো রীতি এখনও ধরে রেখেছে পরিবার। তবে এই পুজোর সবচেয়ে আবেগময় গল্প সম্ভবত দেবীর নয়, পরিবারের মানুষদের ঘরে ফেরার গল্প। বছরের বাকি সময় কাজের সূত্রে পরিবারের বহু সদস্য বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকেন। কিন্তু দুর্গাপুজোর কয়েকটি দিনের জন্য তাঁরা আবার ফিরে আসেন পুরনো বাড়িতে। পুজো হয়ে ওঠে পরিবারের পুনর্মিলনের সময়।

এই পুজোর প্রস্তুতিও শুরু হয় বেশ আগে। উল্টো রথের দিন হয় কাঠামো পুজো। তারপর শুরু হয় প্রতিমা তৈরির কাজ। মহালয়ায় হয় চক্ষুদান। অর্থাৎ দেবীর আগমন যেন শুধু ষষ্ঠীর দিন থেকে নয়; রথের সময় থেকেই তার অপেক্ষা শুরু হয়ে যায়। পুজোর প্রতিটি ধাপের সঙ্গে পরিবারের বহু প্রজন্মের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির পুজোর ভোগেও রয়েছে এক অভিনব পারিবারিক রীতি। সপ্তমী থেকে নবমী—টানা তিন দিন মায়ের ভোগে দেওয়া হয় মাছ। নবমীর ভোগের কিছুটা অংশ রেখে দেওয়া হয় দশমীর জন্য। বিজয়ার দিন সেই ভোগ দিয়েই তৈরি হয় পান্তা ভোগ, যা দেবীকে নিবেদন করা হয়। সময়ের সঙ্গে বাড়ির অনেক কিছু বদলালেও এই ভোগের রীতি বদলায়নি।

এই একটি রীতির মধ্যেই যেন বাংলার খাদ্যসংস্কৃতি, পারিবারিক বিশ্বাস এবং দুর্গাপুজোর নিজস্বতা একসঙ্গে ধরা পড়ে। সর্বজনীন পুজোর ভোগের সঙ্গে বনেদি বাড়ির ভোগের পার্থক্য এখানেই—প্রতিটি বাড়ির রান্নার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাদের নিজস্ব ইতিহাস। কোনও একটি পদ হয়তো শুধুই একটি খাবার নয়; সেটি পরিবারের কাছে পূর্বপুরুষদের সময় থেকে চলে আসা একটি স্মৃতি।বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির পুজোর আরও একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল মায়ের আসন ও পুজোর জায়গা। বাড়ির মূল মঞ্চ ইট-পাথরের হলেও দেবীর আসন এবং পুজোর জায়গা এখনও মাটির। পরিবারের দাবি, পুজোর শুরু থেকেই এই রীতি চলে আসছে। সময়ের সঙ্গে বাড়ির অন্যান্য অংশে পরিবর্তন এলেও এই জায়গাটি বদলায়নি। এমনকি বংশপরম্পরায় একই শিল্পীর পরিবারের সদস্যরা এই বাড়ির প্রতিমা তৈরি করে আসছেন। ফলে পুজোর সঙ্গে শুধু বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার নয়, মৃৎশিল্পী পরিবারেরও কয়েক প্রজন্মের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

এই সম্পর্কটি বনেদি বাড়ির পুজোর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে সামনে আনে। দুর্গাপুজো কখনও শুধু একটি পরিবারের অনুষ্ঠান ছিল না। প্রতিমাশিল্পী, পুরোহিত, ঢাকি, রান্নার কাজে যুক্ত মানুষ, বাড়ির কর্মী এবং আশপাশের মানুষ—অনেকের জীবন ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পুজো। কয়েক প্রজন্ম ধরে একই শিল্পীর পরিবার যদি একই বাড়ির প্রতিমা তৈরি করে, তাহলে সেটি আর শুধুই কাজের সম্পর্ক থাকে না; সেটিও হয়ে ওঠে ঐতিহ্যের অংশ।নবদ্বীপের এই পুজোগুলির দিকে তাকালে তাই একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে—বৈষ্ণব সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই শহরে শাক্ত আরাধনার এত বৈচিত্র্য কীভাবে টিকে রয়েছে। এর উত্তর হয়তো বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে। বাংলায় বৈষ্ণব ও শাক্ত ভাবধারা বহু জায়গাতেই পাশাপাশি প্রবাহিত হয়েছে। একজন মানুষ কৃষ্ণের নাম করতে পারেন, আবার দুর্গার সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের কাছে প্রার্থনা করতে পারেন। ভক্তির এই বহুমাত্রিকতাই বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

নবদ্বীপের পুজোগুলিতে তাই দুর্গা শুধু মহিষাসুরমর্দিনী নন। তিনি পরিবারের মা, কুলদেবী, ঘরের ঐতিহ্যের কেন্দ্র এবং বহু প্রজন্মের স্মৃতির ধারক। লালদুর্গার পশ্চিমমুখী মুখের দিকে তাকালে যেমন একটি অলৌকিক কাহিনি মনে পড়ে, তেমনই বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির পুজোয় সপ্তমী থেকে নবমীর মাছের ভোগের গল্প শুনলে মনে হয়, খাদ্যও কীভাবে একটি পরিবারের ইতিহাস বহন করতে পারে।চন্দ্র পরিবারের মতো নবদ্বীপের আরও কিছু বনেদি বাড়ির পুজোও সাবেকি রীতির ধারাবাহিকতা বহন করে চলেছে। ফলে শহরের দুর্গাপুজোর মানচিত্রে নবদ্বীপকে শুধু চৈতন্যের শহর বা বৈষ্ণব তীর্থ হিসেবে দেখলে তার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। এই শহরের আর একটি পরিচয় হল তার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো—যেখানে শাক্ত আরাধনা স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে এক নিজস্ব রূপ নিয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, এই পুজোগুলি আজও শুধু অতীতের স্মৃতি হয়ে নেই। এখনও পরিবার ফিরে আসে, প্রতিমা তৈরি হয়, চক্ষুদান হয়, ভোগ রান্না হয়, পুরনো নিয়ম পালন করা হয়। সময়ের সঙ্গে জাঁকজমক কমতে পারে, বাড়ির কাঠামো বদলাতে পারে, পরিবারের মানুষ দূরে চলে যেতে পারেন—কিন্তু পুজোর কয়েকটি দিনে সবাই আবার ফিরে আসেন নিজের শিকড়ের কাছে।দুর্গাপুজোর এই ঘরে ফেরার গল্পই হয়তো নবদ্বীপের বনেদি বাড়িগুলির সবচেয়ে বড় সম্পদ। দেবী আসেন বছরে একবার। তাঁর সঙ্গে ফিরে আসে হারিয়ে যাওয়া মুখ, পুরনো গল্প, পূর্বপুরুষের স্মৃতি এবং পরিবারের নিজস্ব রীতিগুলি। লালদুর্গার রক্তবর্ণ মুখ, পশ্চিমমুখী দৃষ্টি, বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির মাটির আসন, মাছের ভোগ কিংবা পান্তা ভোগ—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় বাংলার দুর্গাপুজোর এক বহুরঙা ছবি।

নবদ্বীপ তাই শুধু বৈষ্ণব সংস্কৃতির শহর নয়; এটি বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সহাবস্থানেরও এক জীবন্ত উদাহরণ। এখানে কীর্তনের শহরে ঢাক বাজে, কৃষ্ণভক্তির মাটিতে দুর্গার আরাধনা হয়, আর কয়েক শতাব্দী ধরে পরিবারগুলি নিজেদের মতো করে মাকে বরণ করে চলেছে।শরতের আকাশে যখন সাদা মেঘ ভাসে, গঙ্গা-পদ্মার বাতাসে উৎসবের গন্ধ মেশে, তখন নবদ্বীপের পুরনো বাড়িগুলির ঠাকুরদালানেও যেন সময় থমকে দাঁড়ায়। কয়েকশো বছর আগের কোনও এক শরৎ থেকে আজকের শরৎ—মাঝখানে বদলে গেছে পৃথিবী, কিন্তু বদলায়নি মায়ের কাছে ফিরে আসার আকুলতা।

এই কারণেই নবদ্বীপের বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো শুধু পুজো নয়—এ বাংলার বিশ্বাস, ভক্তি, পারিবারিক স্মৃতি এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক জীবন্ত উত্তরাধিকার।

Archive

Most Popular