28th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

হুগলির আঁইয়া গ্রামের গাঙ্গুলিবাড়ির পুজো, আর ভোগের বিশেষত্ব।

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাস যতটা শহরের, ততটাই গ্রামের। কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোর কথা বলতে বলতে আমরা অনেক সময় ভুলেই যাই, বাংলার গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে রয়েছে এমন অসংখ্য পারিবারিক পুজো, যাদের বয়স, আচার এবং স্মৃতির গভীরতা কোনও অংশে কম নয়। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, হুগলির আঁইয়া গ্রামের গাঙ্গুলিবাড়ির দুর্গাপুজো সেই গ্রামীণ বাংলারই এক অনন্য উত্তরাধিকার। আর এই পুজোর গল্পে দেবীর আরাধনার সঙ্গে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে ভোগের নিজস্ব ঐতিহ্য।গ্রামের দুর্গাপুজোর চরিত্র অনেকটাই আলাদা। এখানে পুজোকে ঘিরে আলাদা করে উৎসবের আয়োজন করার প্রয়োজন হয় না; গোটা গ্রামই যেন উৎসবের অংশ হয়ে ওঠে। বাড়ির উঠোন, পুকুরঘাট, গ্রামের পথ, আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা—সব মিলিয়ে পুজো ছড়িয়ে পড়ে দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে। একটি পরিবারের পুজো ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে বহু মানুষের আনন্দের জায়গা। গাঙ্গুলিবাড়ির পুজোকেও সেই বৃহত্তর গ্রামীণ পরিসরের মধ্যেই দেখতে হয়।প্রাচীন পারিবারিক পুজোর ক্ষেত্রে ভোগ কেবল খাবার নয়। এটি পুজোর সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেবীর উদ্দেশে নিবেদিত অন্ন, ফল, মিষ্টি কিংবা নানা পদকে ঘিরে থাকে পরিবারের নিজস্ব রীতি। কোনও বাড়িতে নিরামিষ ভোগের দীর্ঘ তালিকা, কোথাও আবার বিশেষ কোনও একটি পদই হয়ে ওঠে পুজোর পরিচয়। বছরের পর বছর একই স্বাদ, একই পদ্ধতি এবং একই রান্নার স্মৃতি ধরে রাখার মধ্য দিয়েই তৈরি হয় পারিবারিক ভোগের ঐতিহ্য।

আঁইয়া গ্রামের গাঙ্গুলিবাড়ির পুজোর বিশেষত্বও সেই ভোগের ধারায়। এই ভোগ শুধু দেবীর উদ্দেশে নিবেদন নয়, পরিবারের সদস্য এবং আগত মানুষজনের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া এক সামাজিক আনন্দ। বাংলার গ্রামীণ সমাজে পুজোর ভোগের সঙ্গে যে মিলনোৎসবের সম্পর্ক, এই পুজো তারই স্মৃতি বহন করে।

একসময় বনেদি পরিবারগুলির পুজোয় রান্নাবান্নার দায়িত্ব ছিল বাড়িরই। পুজোর অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত প্রস্তুতি। চাল, ডাল, শাকসবজি, মশলা, ফলমূল—সবকিছুর ব্যবস্থা করা হত নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে। রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন বাড়ির মহিলারা। বড় হাঁড়ি, কড়াই, শিলনোড়া, কাঠের উনুন—সবকিছু মিলিয়ে পুজোর রান্নাঘরও হয়ে উঠত উৎসবের অন্যতম কেন্দ্র।আজকের দিনে রান্নার পদ্ধতি বদলেছে, উপকরণের জোগান সহজ হয়েছে, সময়ও কমেছে। কিন্তু পুরনো পারিবারিক পুজোর ক্ষেত্রে ভোগের স্বাদ ও রীতি ধরে রাখার চেষ্টা এখনও দেখা যায়। কারণ ভোগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শৈশবের স্মৃতি। কোনও একজনের কাছে সেই স্বাদ মানে ঠাকুমার হাতের রান্না, কারও কাছে মায়ের ব্যস্ততা, কারও কাছে পুজোর সকালে নতুন জামা পরে ভোগের অপেক্ষা।

গ্রামীণ দুর্গাপুজোয় এই স্মৃতির পরিসর আরও বিস্তৃত। বাড়ির সদস্যদের পাশাপাশি গ্রামের মানুষও পুজোর সঙ্গে যুক্ত হন। দেবীর প্রসাদ ভাগ হয়ে যায় এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে। পুজোর দিনগুলিতে আত্মীয়স্বজন দূরদূরান্ত থেকে ফিরে আসেন। বহুদিন পর দেখা হয় ভাইবোন, জ্যাঠা-কাকা, মামা-মাসি এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে। ফলে ভোগের পাতটিও হয়ে ওঠে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি উপলক্ষ।

গাঙ্গুলিবাড়ির পুজোর ভোগের বিশেষত্বকে তাই শুধু কোন পদ রান্না হয়, সেই প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তার আসল তাৎপর্য ধরা পড়বে না। বরং দেখতে হবে, সেই রান্নার সঙ্গে কত বছরের পারিবারিক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। একটি পদ হয়তো আজও একইভাবে রান্না হয়, কারণ পরিবারের প্রবীণরা মনে করেন, তাঁদের পূর্বপুরুষরাও সেই একই স্বাদে দেবীকে ভোগ নিবেদন করতেন। সেই ধারাবাহিকতাই একটি সাধারণ রান্নাকে ঐতিহ্যে পরিণত করে।বাংলার পুজোর রান্নার সঙ্গে ঋতুরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শরৎকাল মানেই নতুন ফসলের অপেক্ষা, বাজারে তাজা শাকসবজি, নানা ফল এবং মিষ্টির সমারোহ। গ্রামবাংলায় স্থানীয়ভাবে পাওয়া উপকরণ দিয়ে রান্না করার ঐতিহ্য ছিল দীর্ঘদিনের। ফলে একটি পরিবারের ভোগের পদে তার স্থানীয় পরিবেশেরও ছাপ পড়ত। সেই কারণেই এক অঞ্চলের পুজোর ভোগের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের ভোগের পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

আঁইয়া গ্রামের গাঙ্গুলিবাড়ির পুজোর মতো গ্রামীণ পারিবারিক উৎসব এই স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতিকেও বাঁচিয়ে রাখে। শহুরে জীবনে যে সমস্ত পুরনো রান্না ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে, অনেক সময় সেগুলিই এখনও কোনও পারিবারিক পুজোর রান্নাঘরে জায়গা করে নেয়। রান্নার পদ্ধতিও চলে আসে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে—কখন কতটা মশলা, কখন আঁচ কমাতে হবে, কোন উপকরণ আগে দিতে হবে, কীভাবে রান্না করলে সেই পুরনো স্বাদটি পাওয়া যাবে—এসব অনেকটাই শেখানো হয় চোখে দেখে।

এই শেখার মধ্যে রয়েছে এক ধরনের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। একটি রেসিপি লিখে রাখা না থাকলেও তা হারিয়ে যায় না, যদি কেউ সেটি পরের প্রজন্মকে শিখিয়ে দেন। পুজোর রান্নাঘর তাই অনেক সময় পরিবারের অদৃশ্য ইতিহাসের ভাণ্ডার হয়ে ওঠে।দুর্গাপুজোর ভোগের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তার ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি। দেবীর কাছে নিবেদনের পর সেই খাবার আর কেবল একটি পরিবারের থাকে না। প্রসাদ হিসেবে তা ছড়িয়ে যায়। এই ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে বাঙালি উৎসবের অন্যতম মূল দর্শন—আনন্দ একা ভোগ করার নয়, সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার।আজ যখন দুর্গাপুজো ক্রমশ বড় মাপের জনউৎসবে পরিণত হয়েছে, তখন আঁইয়া গ্রামের গাঙ্গুলিবাড়ির মতো পারিবারিক পুজো আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় অন্য এক সময়ে। সেখানে পুজোর মূল আকর্ষণ আলোকসজ্জা বা বিশাল মণ্ডপ নয়। দেবী আছেন বাড়ির আপন পরিসরে। তাঁর সামনে পরিবারের মানুষ দাঁড়ান, গ্রামের মানুষ আসেন, রান্নাঘরে ভোগ তৈরি হয় এবং পুজোর শেষে সেই খাবার ভাগ হয়ে যায় সকলের মধ্যে।

এই সরলতার মধ্যেই রয়েছে এই ধরনের পুজোর সৌন্দর্য। এখানে ঐতিহ্য প্রদর্শন করার বিষয় নয়; বরং তা পালন করার বিষয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে রীতি চলে এসেছে, সেটিকে যত্ন করে ধরে রাখাই যেন পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।আঁইয়া গ্রামের গাঙ্গুলিবাড়ির দুর্গাপুজো তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাস শুধু শহরের প্রাসাদ বা রাজবাড়িতে লেখা হয়নি। গ্রামের বাড়ির ঠাকুরদালানেও তার অসংখ্য অধ্যায় রচিত হয়েছে। আর সেই ইতিহাসের একটি বড় অংশ লেখা হয়েছে রান্নাঘরের ধোঁয়া, উনুনের আঁচ, ভোগের গন্ধ এবং পরিবারের মানুষের হাতে।দেবীর সামনে সাজানো ভোগের থালায় তাই শুধু খাবার থাকে না। থাকে বহু বছরের বিশ্বাস, পারিবারিক স্মৃতি, গ্রামের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এবং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়া ভালোবাসা। শরতের আকাশের নীচে যখন ঢাক বাজে, ধূপের গন্ধে ভরে ওঠে উঠোন, তখন সেই ভোগের গন্ধও যেন বলে দেয়—পুজো শুধু দেবীকে বরণ করার উৎসব নয়, নিজের শিকড়কেও একবার ফিরে দেখার সময়।

আর সেই কারণেই হুগলির আঁইয়া গ্রামের গাঙ্গুলিবাড়ির পুজো আজও গুরুত্বপূর্ণ। দেবীর আরাধনার পাশাপাশি তার ভোগের ঐতিহ্যও বহন করে চলেছে গ্রামবাংলার এক টুকরো খাদ্যসংস্কৃতি, পারিবারিক স্মৃতি ও মিলনের ইতিহাস।

Archive

Most Popular