প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
হাওড়ার আন্দুল। কলকাতার খুব কাছে হয়েও যেন নিজের মধ্যে আজও বয়ে নিয়ে চলেছে এক অন্য সময়ের গন্ধ। পুরনো রাজবাড়ি, জমিদারবাড়ি, দালানকোঠা আর বনেদি পরিবারের স্মৃতির সঙ্গে এই জনপদের ইতিহাস জড়িয়ে আছে বহুদিনের। আর শরৎ এলেই সেই ইতিহাসের পাতাগুলি যেন নতুন করে খুলে যায়। ঢাকের শব্দ, ধূপের গন্ধ আর শিউলির সুবাসের মধ্যে আন্দুলের পুরনো বাড়িগুলির ঠাকুরদালান ফিরে পায় তার বহুদিনের পরিচিত চেহারা। সেই ঐতিহ্যেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মল্লিকফটকের ভট্টাচার্য বাড়ির দুর্গাপুজো। তবে এই পুজোর বিশেষত্ব কেবল তার প্রাচীনত্বে নয়, এর কেন্দ্রে রয়েছেন এক বিশেষ অধিষ্ঠাত্রী দেবী—সিদ্ধেশ্বরী-শঙ্করী।বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাস আসলে এক একটি পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিশ্বাসের ইতিহাস। কোথাও দেবী কুলদেবী, কোথাও স্বপ্নাদেশে পাওয়া, কোথাও আবার কোনও বিশেষ রূপে পূজিতা হয়ে আসছেন। মল্লিকফটকের ভট্টাচার্য বাড়ির ক্ষেত্রেও দেবীর পরিচয় সাধারণ দুর্গামূর্তির পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সিদ্ধেশ্বরী-শঙ্করী নামের মধ্যেই যেন মিশে আছে শক্তি ও শৈব ভাবনার এক গভীর যোগ। দেবী এখানে শুধুই মহিষাসুরমর্দিনী নন; তিনি পরিবারের আরাধ্যা শক্তি, যাঁকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক পরম্পরা।
‘সিদ্ধেশ্বরী’ নামের মধ্যে রয়েছে সিদ্ধির ভাবনা, আর ‘শঙ্করী’ শব্দটি সরাসরি শঙ্করের সঙ্গে দেবীর সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়। বাংলার শাক্ত উপাসনায় দেবীর নানা নাম ও রূপের যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, এই নামটিও তারই একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। দুর্গার আরাধনা যে কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রতিমারূপ বা একটি নির্দিষ্ট আচারেই সীমাবদ্ধ নয়, মল্লিকফটকের ভট্টাচার্য বাড়ির পুজো যেন তারই সাক্ষ্য বহন করে।আন্দুলের মতো প্রাচীন জনপদে বনেদি বাড়ির পুজো কখনও নিছক পারিবারিক উৎসব ছিল না। বাড়ির ঠাকুরদালান হয়ে উঠত বৃহত্তর সমাজেরও মিলনস্থল। পুজোর কয়েকটি দিন পরিবারের মানুষজন যেমন একত্রিত হতেন, তেমনই আশপাশের মানুষও দেবী দর্শনে আসতেন। বাড়ির অন্দরমহলের পুজো ধীরে ধীরে হয়ে উঠত পাড়ার স্মৃতির অংশ। ফলে একটি বনেদি বাড়ির দুর্গোৎসবকে বুঝতে গেলে শুধু প্রতিমা বা পুজোর দিনগুলির দিকে তাকালে হয় না; দেখতে হয় তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষ, স্থান এবং সময়কেও।
মল্লিকফটকের ভট্টাচার্য বাড়ির পুজোর ক্ষেত্রেও সেই পারিবারিক উত্তরাধিকারের গুরুত্ব রয়েছে। প্রজন্ম বদলায়, বাড়ির মানুষের জীবনযাত্রা বদলায়, পুরনো বাড়ির অনেক কিছুতেই পরিবর্তন আসে। কিন্তু দেবীর আরাধনা থেকে যায়। কারণ বনেদি বাড়ির পুজোর সবচেয়ে বড় শক্তি তার আড়ম্বর নয়, তার ধারাবাহিকতা। যে পুজো এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পৌঁছে যায়, সেখানে প্রতিটি আচার হয়ে ওঠে পূর্বপুরুষের স্মৃতির সঙ্গে বর্তমানের একটি সেতু।এই পুজোর অধিষ্ঠাত্রী দেবী সিদ্ধেশ্বরী-শঙ্করী—এই পরিচয়টিই তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার বহু প্রাচীন পরিবারে কুলদেবী বা অধিষ্ঠাত্রী দেবীর আরাধনা দুর্গাপুজোর সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছে। কখনও দেবী দুর্গার প্রচলিত রূপের পাশাপাশি কোনও বিশেষ দেবীমূর্তি পূজিত হন, কখনও আবার দুর্গার মধ্যেই পরিবারের আরাধ্যা শক্তির রূপ খুঁজে নেওয়া হয়। এই ধারার মধ্যে সিদ্ধেশ্বরী-শঙ্করীর নাম একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় তৈরি করে।
দুর্গাপুজোর চার দিন তাই এখানে কেবল শাস্ত্রনির্দিষ্ট তিথির পরপর আচার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের বহু পুরনো স্মৃতি। কে কখন পুজোর কাজে দায়িত্ব নিতেন, কার হাতে কোন কাজের ভার ছিল, কোন প্রজন্ম কীভাবে দেবীর সামনে বসত—এইসব ছোট ছোট পারিবারিক স্মৃতিই একটি পুজোকে জীবন্ত রাখে। পুরনো পুজোর আসল ঐশ্বর্য অনেক সময় সোনার গয়না বা বিশাল আয়োজনের মধ্যে নয়, এই অদৃশ্য উত্তরাধিকারের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোয় ঠাকুরদালানের ভূমিকা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির স্থাপত্যের একটি অংশ হয়েও ঠাকুরদালান আসলে পরিবারের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। শরতের সকালে সেখানে যখন ধূপের ধোঁয়া ওঠে, পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ শোনা যায়, তখন মনে হয় এই একই জায়গায় কত প্রজন্ম আগে একইভাবে পুজো হয়েছিল। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, কিন্তু দেবীর সামনে দাঁড়ানোর সেই মুহূর্তটি যেন একই রয়ে গেছে।
মল্লিকফটকের ভট্টাচার্য বাড়ির পুজোর মতো বনেদি পুজোগুলির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পারিবারিক ঐক্য। সারা বছর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকলেও পুজো তাঁদের আবার এক জায়গায় নিয়ে আসে। কারও কাছে এটি নিজের শৈশবে ফিরে যাওয়ার সময়, কারও কাছে পূর্বপুরুষের স্মৃতি ফিরে পাওয়ার সময়, আবার কারও কাছে নতুন প্রজন্মকে পরিবারের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময়।আজকের দিনে সর্বজনীন দুর্গাপুজোর জাঁকজমক যখন শহরের উৎসবকে নতুন মাত্রা দিয়েছে, তখন বনেদি বাড়ির পুজোর আকর্ষণ অন্য জায়গায়। এখানে আলো কম হতে পারে, ভিড় কম হতে পারে, আয়োজনও হয়তো আগের মতো বিপুল নয়। কিন্তু রয়েছে ইতিহাসের গভীরতা। একটি পরিবারের শতবর্ষের স্মৃতি, একটি নির্দিষ্ট দেবীর প্রতি প্রজন্মের পর প্রজন্মের বিশ্বাস এবং একই নিয়মকে ধরে রাখার চেষ্টা—এই জিনিসগুলির কোনওটাই নতুন করে তৈরি করা যায় না।
সিদ্ধেশ্বরী-শঙ্করীর আরাধনার মধ্যে সেই পুরনো বিশ্বাসই আজও বেঁচে আছে। দেবীর নাম উচ্চারণের মধ্যেই যেন শাক্ত ও শৈব ভাবধারার একটি মিলন ঘটে। ‘শঙ্করী’ নামটি মনে করিয়ে দেয় দেবী ও মহাদেবের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককে, আর ‘সিদ্ধেশ্বরী’ নামটি তাঁকে করে তোলে সিদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী শক্তি। দুর্গাপুজোর বৃহত্তর পরিসরের মধ্যে এই বিশেষ পরিচয় পুজোটিকে একটি নিজস্ব সাংস্কৃতিক চরিত্র দিয়েছে।তবে ঐতিহ্য মানেই যে সবকিছু অপরিবর্তিত থাকবে, তা নয়। সময়ের সঙ্গে বনেদি বাড়ির পুজোর অনেক নিয়মেই বাস্তব পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা কমেছে, কেউ কেউ দূরে চলে গিয়েছেন, পুরনো বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়েছে। কিন্তু ঐতিহ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকু ধরে রাখার চেষ্টা এখনও দেখা যায়। কারণ একটি বনেদি পুজো টিকে থাকে কেবল বাড়ির দেওয়ালে নয়; টিকে থাকে পরিবারের ইচ্ছায়।
আজ যখন নতুন প্রজন্মের অনেকেই নিজেদের পূর্বপুরুষের বাড়ি থেকে দূরে বড় হচ্ছে, তখন এই ধরনের পুজো তাদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। ছোটরা দেখে ঠাকুরদালান, শোনে পুরনো দিনের গল্প, শেখে পরিবারের দেবীর নাম। কোনও কোনও গল্প হয়তো লিখিত ইতিহাসের পাতায় নেই, কিন্তু ঠাকুমা-দিদার মুখে মুখে বেঁচে থাকে। পরের প্রজন্ম যখন সেই গল্প আবার বলে, তখনই তৈরি হয় ইতিহাসের আর একটি স্তর।আন্দুলের মল্লিকফটকের ভট্টাচার্য বাড়ির পুজো তাই শুধু একটি পুরনো দুর্গোৎসব নয়। এটি একটি পরিবারের ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক স্মৃতি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ধারক। অধিষ্ঠাত্রী দেবী সিদ্ধেশ্বরী-শঙ্করী সেই পরম্পরার কেন্দ্রে থেকে আজও যেন পরিবারের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে রাখেন।
শরতের আকাশে যখন মেঘ ভাসে, কাশফুল দোলে আর দূর থেকে ভেসে আসে ঢাকের আওয়াজ, তখন আন্দুলের পুরনো বাড়িগুলিও যেন জেগে ওঠে। মল্লিকফটকের ভট্টাচার্য বাড়ির ঠাকুরদালানে তখন দেবীর সামনে জ্বলে ওঠে প্রদীপ। সময়ের বহু বাঁক পেরিয়ে সেই আলো আজও বলে যায়—ঐতিহ্য মানে শুধু অতীতকে মনে রাখা নয়, তাকে পরের প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া।আর সেই উত্তরাধিকারের কেন্দ্রে, নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়ে, অধিষ্ঠান করেন সিদ্ধেশ্বরী-শঙ্করী—মা দুর্গারই এক নিজস্ব, পারিবারিক এবং গভীরভাবে বাংলার মাটির সঙ্গে যুক্ত রূপ।