প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়িগুলির কথা যেমন বারবার উঠে আসে, তেমনই দক্ষিণ কলকাতার বেহালার অলিগলিতেও ছড়িয়ে রয়েছে বহু পুরনো পারিবারিক পুজোর গল্প। এই পুজোগুলির প্রত্যেকটির নিজস্ব ইতিহাস আছে, নিজস্ব দেবীর রূপ আছে, আছে এমন কিছু রীতি যা সময়ের স্রোতেও হারিয়ে যায়নি। বেহালার জগৎ রাম মুখোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গাপুজোও তেমনই এক ঐতিহ্য, যার অন্যতম আকর্ষণ দেবীর সোনালি সাজ।
দুর্গাপুজোর প্রতিমা মানেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে রং, অলংকার এবং সাজসজ্জায় ভরা দেবীমূর্তি। কিন্তু বনেদি বাড়ির পুজোয় প্রতিমার সাজের মধ্যেও থাকে পরিবারের নিজস্ব পরিচয়। কোথাও ডাকের সাজ, কোথাও সাবেকি গয়না, কোথাও মাটির অলংকার, কোথাও আবার সোনালি আভায় সম্পূর্ণ অন্যরকম এক রূপ। জগৎ রাম মুখোপাধ্যায় বাড়ির দেবীর সোনালি সাজ সেই স্বাতন্ত্র্যেরই পরিচায়ক।সোনালি রং ভারতীয় সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরেই ঐশ্বর্য, পবিত্রতা ও আলোর প্রতীক। দেবীর সাজে সোনালি আভা তাই শুধু সৌন্দর্য বাড়ায় না, তাঁর মধ্যে এক রাজকীয় দীপ্তিও এনে দেয়। শরতের সকালের আলো যখন প্রতিমার গায়ে এসে পড়ে, তখন সেই সোনালি সাজ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সন্ধ্যার প্রদীপের আলোয় আবার একই প্রতিমার মধ্যে তৈরি হয় অন্যরকম এক আবহ—নরম, গম্ভীর এবং মায়াময়।
বনেদি বাড়ির পুজোয় এই সাজের মূল্য আরও বেশি, কারণ তা কোনও সাময়িক ফ্যাশনের অংশ নয়। বছরের পর বছর একই ধরনের সাজ ধরে রাখার মধ্য দিয়ে একটি পরিবার তার নিজস্ব পরিচয় তৈরি করে। নতুন নতুন থিমের পুজোর ভিড়ে যখন প্রতিমার রূপ প্রতি বছর বদলে যায়, তখন কোনও পুরনো বাড়ির দেবী একই পরিচিত সাজে ফিরে আসেন—এই ধারাবাহিকতাই দর্শকের মনে আলাদা অনুভূতি তৈরি করে।জগৎ রাম মুখোপাধ্যায় বাড়ির পুজোর ক্ষেত্রেও দেবীর এই সোনালি সাজ যেন সময়ের সঙ্গে একটি দৃশ্যমান সংযোগ তৈরি করে। বর্তমান প্রজন্ম যখন সেই প্রতিমার সামনে দাঁড়ায়, তাদের আগে বহু প্রজন্মের মানুষও একই দেবীর সামনে দাঁড়িয়েছেন। প্রজন্ম বদলেছে, পোশাক বদলেছে, বাড়ির মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, কিন্তু দেবীর সাজের পরিচিত আভা থেকে গেছে।এখানেই বনেদি বাড়ির পুজোর সৌন্দর্য। একটি প্রতিমা কখনও কখনও পরিবারের স্মৃতির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ছোটবেলায় যে দেবীকে দেখে কেউ বড় হয়েছে, বহু বছর পরে ফিরে এসে সেই একই মুখ, একই সাজ দেখতে পেলে তার মনে শৈশবের নানা ছবি ফিরে আসে। পুজোর সকাল, নতুন জামা, বাড়ির উঠোন, আত্মীয়দের ভিড়, ঢাকের শব্দ—সবকিছু যেন সেই প্রতিমার সঙ্গে মিশে থাকে।
দুর্গাপুজোর সঙ্গে বেহালার সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। শহরের বিস্তারের সঙ্গে বেহালা বদলেছে, জনসংখ্যা বেড়েছে, নতুন আবাসন তৈরি হয়েছে, রাস্তার চেহারা বদলেছে। কিন্তু পুরনো বাড়িগুলির কিছু কিছু পুজো এখনও সেই পরিবর্তনের মধ্যে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ধরে রেখেছে। ফলে বেহালার মতো দ্রুত বদলে যাওয়া অঞ্চলের মধ্যেও পুরনো পারিবারিক পুজোগুলি অতীতের সঙ্গে বর্তমানের একটি সেতু তৈরি করে।জগৎ রাম মুখোপাধ্যায় বাড়ির পুজোকে সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রেক্ষিতেও দেখা যায়। একসময় কলকাতার প্রান্তবর্তী অঞ্চলগুলির অনেক জায়গাতেই ছিল জমিদার বা সম্ভ্রান্ত পরিবারের বড় বড় বাড়ি। সেই বাড়িগুলিতে দুর্গাপুজো ছিল সামাজিক জীবনের অন্যতম প্রধান অনুষ্ঠান। পুজোর সময় দূরদূরান্ত থেকে আত্মীয়রা আসতেন, বাড়িতে অতিথিদের আনাগোনা চলত, রান্নাঘরে ব্যস্ততা বাড়ত, আর ঠাকুরদালান হয়ে উঠত পরিবারের মিলনকেন্দ্র।
আজকের দিনে সেই পারিবারিক কাঠামো অনেকটাই বদলে গেছে। যৌথ পরিবার ভেঙেছে, পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছেন। কিন্তু পুজোর সময় পুরনো বাড়িতে ফিরে আসার রীতিটি এখনও অনেক পরিবার ধরে রেখেছে। দেবীর সামনে একসঙ্গে দাঁড়ানোর এই অভ্যাসই হয়তো পুরনো পুজোগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম শক্তি।এই ধরনের পুজোয় প্রতিমার সাজ তাই শুধু দর্শকের চোখের জন্য নয়; পরিবারের জন্যও তার আলাদা অর্থ আছে। দেবীর গয়না বা সাজের কোনও অংশ হয়তো বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। কোনও অলংকারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে পূর্বপুরুষের স্মৃতি। আবার কোনও সাজ হয়তো পরিবারের নিজস্ব রীতি হিসেবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে এসেছে। প্রতিটি উপকরণের ইতিহাস জানা থাকলে বোঝা যায়, একটি প্রতিমাকে সাজানোও কীভাবে একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হয়ে উঠতে পারে।
সোনালি সাজের মধ্যে তাই শুধু ঐশ্বর্য নেই, আছে স্মৃতির আলোও। দেবীর মুখে যখন আলো পড়ে, সেই আলো যেন পুরনো দিনের গল্পকেও দৃশ্যমান করে। বহু বছর আগে যে উঠোনে পুজোর আয়োজন হয়েছিল, আজও হয়তো সেখানে ঢাক বাজে। যাঁরা একসময় এই পুজোর প্রধান দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের অনেকে আর নেই। কিন্তু তাঁদের শেখানো নিয়ম এখনও পরবর্তী প্রজন্ম পালন করে।
বনেদি বাড়ির পুজোর ক্ষেত্রে এই উত্তরাধিকারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি পরিবার তখনই তার পুজোকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, যখন নতুন প্রজন্ম শুধু দর্শক হয়ে থাকে না, অংশ নেয়। পুজোর কোনও কাজ শেখা, দেবীর সাজের বিষয়ে জানা, পুরনো রীতির কারণ বোঝা কিংবা প্রবীণদের কাছ থেকে পরিবারের ইতিহাস শোনা—এসবের মধ্য দিয়েই ঐতিহ্য জীবন্ত থাকে।আর সেই জীবন্ত ঐতিহ্যের কেন্দ্রেই থাকেন দেবী। সোনালি সাজে তাঁর উপস্থিতি যেন প্রতিবারই ঘোষণা করে—সময় বদলেছে, কিন্তু গল্প শেষ হয়নি।দুর্গাপুজোর আর একটি সুন্দর দিক হল, দেবীর আগমন প্রতি বছর নতুন হলেও তাঁর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক পুরনো। চারদিনের জন্য তিনি আসেন, তারপর বিসর্জনে চলে যান। কিন্তু বনেদি বাড়ির ক্ষেত্রে সেই বিদায় যেন চিরবিদায় নয়। সবাই জানে, পরের শরতে তিনি আবার ফিরবেন। আবার সেই একই ঠাকুরদালান, আবার একই সাজ, আবার পরিচিত মুখগুলির ভিড়।এই অপেক্ষাই পুজোর আবেগকে আরও গভীর করে। সারা বছর বাড়িটি হয়তো শান্ত থাকে। কিন্তু পুজোর সময় তার প্রতিটি কোণ যেন জেগে ওঠে। পুরনো দেওয়াল, সিঁড়ি, উঠোন, বারান্দা—সবকিছুর মধ্যেই জমে থাকা স্মৃতি আবার নতুন করে আলো পায়। দেবীর সোনালি সাজ সেই আলোর কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
বেহালার জগৎ রাম মুখোপাধ্যায় বাড়ির পুজো তাই শুধুই একটি পুরনো পারিবারিক দুর্গোৎসব নয়। এটি এমন এক ঐতিহ্যের গল্প, যেখানে দেবীর সাজ নিজেই হয়ে উঠেছে ইতিহাসের ভাষা। সেই সোনালি আভায় রয়েছে পারিবারিক বিশ্বাস, স্মৃতি, নান্দনিকতা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা পুজোর রীতি।আজকের থিমপুজোর জাঁকজমক, আলো আর অভিনবত্বের মধ্যে এই ধরনের বাড়ির পুজো আমাদের অন্য এক সৌন্দর্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। যে সৌন্দর্যের জন্য নতুন কিছু তৈরি করার প্রয়োজন নেই। বরং বহু পুরনো কিছু যত্ন করে ধরে রাখাই যার সবচেয়ে বড় সার্থকতা।সোনালি সাজে দেবী যখন ঠাকুরদালানে অধিষ্ঠিত হন, তখন তাঁর গায়ে শুধু অলংকারের ঝিলিক থাকে না। সেই ঝিলিকের মধ্যে যেন দেখা যায় বহু বছরের পুজো, বহু প্রজন্মের মুখ, অসংখ্য শারদসন্ধ্যা এবং ফিরে আসার এক চিরন্তন প্রতিশ্রুতি।
সময় বদলায়, শহর বদলায়, মানুষ বদলায়। কিন্তু কিছু দেবী একই সাজে ফিরে এসে প্রতি বছর মনে করিয়ে দেন—ঐতিহ্যের আসল সৌন্দর্য তার বদলে যাওয়ায় নয়, টিকে থাকার মধ্যেই।